“আরে ধুর, চাকরি করছি বলে কি একেবারে রাজা হয়ে গেলাম নাকি? আরে এত
রেসপনসিবিলিটি নেয়ার মত বয়স হয়েছে নাকি?.........বেতন দিয়ে কী হবে? এত কাজ কার
ভালো লাগে?............আচ্ছা তুই বাসায় যেয়ে আমাকে জানাস.........হাসছি? কই না,
হাসছি নাতো!!.........আচ্ছা হ্যা রাখি, বাই।” অপু কিন্তু একটু হলেও হেসে ফেলেছিল। ট্রেনে
জানালার ধারে বসে বসে সে যখন কথা বলছিল তার পুরোন বন্ধুর সাথে, ঠিক তখনই তার চোখ
পড়েছিল সামনের ছিটে বসে থাকা মেয়েটার দিকে।আর তাকে দেখেই সে হাসি সামলাতে পারেনি। মজার ব্যপার,
মেয়েটাও তাকিয়ে আছে তার দিকে! কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কেটে গেল এক
মিনিট।
“এক্সকিউজ মি? আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে।” মেয়েটাই বলল
প্রথমে।
“আমারাও” অপুর ছোট্ট উত্তর।
“বাই দ্যা ওয়ে, আপনি হাসছেন কেন?”
“কারন, আমাকে আপনি চিনতে না পারলেও, আপনাকে আমি চিনতে
পেরেছি!”
“চিনতে পেরেছেন ভালো কথা, তো এতে হাসার কী আছে?”
“খুশিতে হাসছি, চিনতে পারার খুশিতে” আবারো অপুর
উত্তর।
“ও!” মেয়েটা মনে হয় বিরক্তই হলো। কিন্তু কৌতুহল
হতে লাগলো খুব। “না, মানে আমাকে যদি একটু সাহায্য করতেন......” কোতুহল
সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল।
“কী করে সাহায্য করি বলুন? আপনার কথা মনে করতে পেরেছি
বটে,কিন্তু, আপনাকেতো আমি চিনিই না!!”
“মানে?” এবারে মেয়েটির ছোট্ট কিন্তু ধারালো প্রশ্ন।
“মানে, আপনাকে কোথায় দেখেছি সেটা আমার মনে পড়েছে, কিন্তু
আপনার সাথে আমার মোটেও পরিচয় নেই!!” এমন একটা
ভাব করে কথাগুলো বলল অপু, যেন এতক্ষণে সে সব রহস্যের জট খুলুল!!
বিরক্তি ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু সেই
সাথে কৌতুহলটাও। বিরক্তি আর বিষ্ময় নিয়ে তাকেলো মেয়েটি। অবশ্য
বিষ্ময়ের চেয়ে বিরক্তিটাই ছিল বেশি। অপুর মনে হলো বিষ্ময়টা সে প্রকাশ করতে চায়নি, কিন্তু
সামলাতেও পারিনি।
“শুনুন, আমি ব্যপারটা খুলেই বলি আপনাকে” আর বেশি
প্যাচানোর সাহস পেল না অপু। “আমি বলতে থাকব, কিন্তু একদমই ইন্টারফেয়ার করতে পারবেন না।” বলেই, উত্তরের
জন্য অপেক্ষা না করে একটু নড়েচড়ে বসে বলা শুরু করলো, “আজ থেকে প্রায়
পাঁচ বছর আগের কথা। সেদিন ছিল অষ্টমী; মানে দূর্গা পূজার অষ্টমী। বগুড়ার
জ্বলেশ্বরীতলার কালী মন্দিরে আমি আমার মা’র মায়ের সাথে গিয়েছিলাম পূজো দিতে, আপনিও এসেছিলেন,
সম্ভবত আপনার দিদির সাথে।মন্ডপে অনেক মহিলা থাকলেও, আমার নজর ছিল শুধু আপনার
দিকেই। আপনিও সম্ভবত দেখছিলেন আমাকে।
“হ্যা মনে পড়ে গেছে, আর না বললেও চলবে, আমার মেমোরী অত ডাল না।” মেয়েটা স্বস্তির
নিঃশ্বাস ফেলল। আর কথা বলার ব্যপারে তার আগ্রহ নেই। কিন্তু, অপু
অনেকটা ধমকের সুরে বলল, “আপনাকে বললাম, ইন্টারফেয়ার করবেন না, তারপরও......” বলেই নব
উদ্যমে বলতে শুরু করল, “আমি দুই ঘন্টা ওখানে বসে, আকাশ-পাতাল অনেক কিছু ভেবেছি
আপনাকে নিয়ে। আমার কিন্তু অবজারভেশন পাওয়ার
ভালো, আমি মানুষকে দেখে, অনেক কিছু বুঝতে পারি।আপনাকে নিয়ে
আমি কী কী ভাবলাম শুনুন। আপনি খুব ভালো ছাত্রী। মেডিকেলে পড়েন। আপনারা দুই
বোন। আপনি ছোট। অনেকদিন পর বাসায় এসছেন, পূজার ছুটিতে। দিদির সাথে
দেখা হয়ে খুব খুশি। অত্যন্ত পারসোনালিটি সম্পন্ন মানুষ আপনি। আর খুব বেশ
পরিশ্রমী মানুষ।
তো আপনাকে দেখার পর বাসায়
এসে কল্পনাটা আরো বেড়ে গেল। ভাবলাম, কল্পনা করতে সবাই পারে না, আবার সবাইকে নিয়ে
কল্পনা হয়ও না। আপনাকে কল্পনা করতে খুব ভালো লাগছিল, ভাবলাম এই
কল্পনাকে কাজে লাগাবো। জীবনে প্রথম বারের মত একটা গল্প লেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু,
গল্পটা রূপ নিল উপন্যাসে!! শেষপর্যন্ত লিখেই ফেললাম। উপন্যাসের
নায়িকা আপনি। অত্যন্ত পারসোনালিটি সম্পন্ন মেয়ে, ছেলেরা আশে পাশে ঘেঁষতে সাহস পায় না,
জীবনে প্রতিকূলতার অভাব নেই,তবুও সব কিছ জয় করে চলেছেন, অতীরিক্ত পুরুষবিদ্বেষী
স্বভাবের, তাই বিয়েই করেননি জীবনে।
আমার জীবনের প্রথম উপন্যাস
কিন্তু এবারের বই মেলায় প্রকাশ হয়েছে। অনেক জনপ্রিয়ও হয়েছে বইটা, সবচেয়ে বড়
কথা আপনার হাতে যে বইটা রয়েছে,মানে যেটা আপনি এতক্ষন পড়ছিলেন সেটাই হলো আমার লেখা
সেই উপন্যাস, “নীরবে””
এতক্ষনে সামনে বসে থাকা মেয়েটার
মুখ থেকে বিরক্তি পূরোপুরি কেটে গিয়ে দেখা দিয়েছে আবাক বিষ্ময়। বেশ কষ্ট করেই
বলল, “মানে, এই “নীরবে” বইটার নায়িকা
আমিই, যে কিনা চিরকূমারী, মেডিকেলের পড়ুয়া ছাত্রী, জীবনে কখোন ছেলেদের সাথে
মেশেনি, আপন বলতে একমাত্র দিদি.........? আপনি কি মনে করেন যে, আমি বাস্তবেই এরকম?”
“অবশ্যই! আমি বললাম না, আমার অবিজারভেশন পাওয়ার ভালো। আমি নিশ্চিত,
আপনি এরকমই, ঠিক না?”
“ঠিক কিনা? তাহলে শুনুন,” এবারে বেশ বড় করে নিশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল, “আমার কোন দিদি
নেই,যাকে দেখেছিলেন সে আমার বৌদি, আমি আর্সের ছাত্রী, ম্যাট্রিক দুই বারে, আর
ইন্টার তিন বারে পাস করেছি, তাও নকল করে, ক্লাস টেনে পড়ার সময়, পালিয়ে গিয়ে বিয়ে
করেছিলাম, ডিভোর্স হয়ে গেছে কিছুদিন আগেই, আমার মত লাইফকে এনজয়, খুব কম মানুষ করতে
পারে। আর কিছু জানতে চান?” একনিশ্বাসে বলে শেষ করল মেয়েটা। অপু হা করে
তাকিয়ে রইল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন