একা একা
রেস্টুরেন্টে বসে ফুচকা খাচ্ছিল অনি। এটা মাঝে মাঝে করে ও। তখন বিকাল পাঁচটা।
হঠাতই দেখতে পেল একটা অল্প বয়েসী ছেলে আর মাঝ বয়সী একটা মহিলা রেস্টুরেন্টে এসে
ঢুকলো। ছেলেটার বয়স একুশ বাইশের বেশি হবে না। আর মহিলার বয়স কত হবে? পয়তাল্লিশ
থেকে পঞ্চাশ; এর মাঝেই হবে। তাহলে সম্পর্কটা কেমন হতে পারে? মা ছেলে? তাই হবে
হয়তো।
রেস্টুরেন্টটা
অনেক ছোট। সবাই বসেছে বেশ কাছাকাছি। ছেলেটার ঠিক পাশের টেবিলেই বসেছে ওরা দুইজন।
ছেলেটার কেন যেন খুব কৌতুহল হলো। কান পেতে থাকলো ওদের দিকে। তাদের কি কথা হয় শুনতে
চেষ্টা করলো।
মহিলাঃ
দেখো, আমি জানি আমার প্রতি তোমার অনেক রাগ, অনেক ক্ষোভ জমা হয়ে আছে। কিন্তু, তুমিই
বলো আমাদের কী করার ছিল?
ছেলেঃ
আমি তোমাকে কোন অভিযোগ করছি নাতো! আমি আমার এই লাইফটাকে অনেক এনজয় করেছি এবং করছি।
আমার আসলেই কাউকে দরকার নেই।
মহিলাঃ
এগুলো যে তোমার রাগের কথা তা আমি ভালভাবেই জানি।
ছেলেঃ
সহজ ব্যপার কেন বুঝছো না? আমার স্মৃতিতেই বলতে গেলে তুমি নেই। আমার স্মৃতিতে বাবা
একাই আছে।
মহিলাঃ
এরকম কেন হয়েছিল সেটা তোমার জানা আছে?
ছেলেঃ
জানতে চাইনি কোনদিন। জেনে কী করবো? আমারতো দরকার হয়নি কখোন কাউকে।
মহিলাঃ
কিন্তু, এমনটা কিন্তু হওয়ার কথা ছিল না। তোমাকে আমরা কম ভালবাসিনি!
ছেলেঃ
সমস্যা কোথায়? আমি ছোটবেলা থেকে এটাই জেনে আসছি যে আমার কোন মা নেই। আমার শুধু
বাবাই আছে।
মহিলাঃ
তুমি যা ভাবছো ব্যপারটা ঠিক সেকরম নয়, এটুকুই বলতে পারি।
ছেলেঃ
আমি নতুন করে আবার কী ভাববো? তুমি নিজের ভাল থাকার জন্য আমার
বাবাকে ডিভোর্স করেছো। বাবার কথা, আমার কথা কারোর কথাই ভাবোনি। আজ আমার সাথে
রাস্তায় দেখা হয়ে তোমার মনে দয়ার উদ্রেক হয়েছে। এত দয়া দেখাতে হবে না। আমি ভাল
আছি।
মহিলাঃ
এই যে বললে না, আমার নিজের ভাল থাকার জন্য তোমার বাবাকে ডিভোর্স করেছি। এটাই তোমার
ভুল ধারণা।
ছেলেঃ
মানে কী? নিজের সুখের জন্য না? তাহলে কার সুখের জন্য? আমার বাবার মত মানুষের
বিরুদ্ধে তুমি অভিযোগ করতে চাচ্ছা? আমি কিন্তু আর সহ্য করবো না! আমার বাবা কিন্তু
আবার বিয়ে করতে পারতো। বাবা সেটা করেনি। তোমাদের ডিভোর্সের কারন বাবা আমাকে কোনদিন
বলেনি, তবে এটুকু বেশ বুঝতে পারি, তুমি নিজের সুখের জন্য ডিভোর্স চেয়েছিলে। তা না
হলে আমার উপর অধিকার তুমি দেখানোর চেষ্টা করতে।
মহিলাঃ
তুমি বড় হয়েছো। আমার মনে হয় সত্যটা তোমার এখন জানা উচিত।
ছেলেঃ
কী সত্য শোনাবে তুমি?
মহিলাঃ
শুনবে তুমি?
ছেলেঃ
শুনবো। বলো।
মহিলাঃ
কাজটা আমি নিজের ভালর জন্য করিনি।
করেছিলাম একজনের কথায়।
ছেলেঃ
আরেকজনের কথায়? মানে?? তুমি আবার বিয়ে করেছো?
মহিলাঃ
যা ভাবছো, তা না। কাজটা আমি করেছিলাম তোমার মা’র কথায়!
ছেলেঃ
মানে?? আমার মা কে?
মহিলাঃ
হ্যা, তোমার মা। আমি তোমার আসল মা নই। তোমার বাবার সাথে আমার বিয়ের আগেই তোমার
জন্ম।
ছেলেঃ
বলছো কি এসব? বাবা আমাকে কোনদিন কিছু বলেনিতো! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমিতো
জানতাম, তোমার আর বাবার অ্যাফেয়ার করে বিয়ে! তাহলে এসব কবে হলো?
মহিলাঃ হ্যা, রিলেশন করেই বিয়ে। কিন্তু, আমার আর তোমার
বাবার রিলেশন তোমার বাবার বাসায় মানেনি কেউ। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম
চিরকুমারী থাকার। আমিতো একটা চালচুলোহীন মেয়ে। আমার কোন সমস্যা ছিল না। আমি দিব্যি
চাকরী করে খাচ্ছিলাম। তোমার বাবা বিয়ে করেন। তোমার জন্ম হয়। হঠাত অসুস্থ হন তোমার
মা। একসময় মারা যান তিনি। খুব ভাল মানুষ ছিলেন শুনেছি। বিপত্নিক হওয়ার পর আমাকে
বিয়ের প্রস্তাব দেন তোমার বাবা। মানুষের কিছু কিছু দূর্বল জায়গা থাকে। এটা ছিল আমার দূর্বল জায়গা। যদিও আমি
শুনেছি তোমার মা আমার কথা জানতেন এবং আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। তবুও তোমার দিকে
তাকিয়ে, তোমার বাবার দিকে
তাকিয়ে আর আবেগের কারণেরই আর “না” করতে
পারিনি। রাজি হয়ে গেলাম বিয়েতে। তবে তোমার বাবা আমাকে কথা দিয়েছিল, একমাত্র তুমি
ছাড়া তার প্রথম স্ত্রীর কোন স্মৃতি সে ঘরে রাখবে না। তোমাকে কখোন জানতে দেবে না
তার কথা। তুমি জানবে আমিই তোমার
মা। আমি যদিও প্রতিবাদ
করেছিলাম। কিন্তু, সে আমার কথা শোনেনি। সে কোনভাবেই তার প্রথম স্ত্রীর কোন স্মৃতি
রাখবে না।
ছেলেঃ তারপর?
মহিলাঃ একদিন ওয়ার্ড্রবের কাপড় গোছাতে গোছাতে হঠাত একটা ডায়েরী পেয়ে গেলাম। ডায়েরীটা তোমার মা’র। জানি কাজটা ঠিক হয়নি; তবুও, কৌতুহল দমন করতে পারিনি। ডায়েরীটা নিয়ে পড়ে ফেলি। সেখানে কী লেখা ছিল জান?
ছেলেঃ কী?
ছেলেঃ তারপর?
মহিলাঃ একদিন ওয়ার্ড্রবের কাপড় গোছাতে গোছাতে হঠাত একটা ডায়েরী পেয়ে গেলাম। ডায়েরীটা তোমার মা’র। জানি কাজটা ঠিক হয়নি; তবুও, কৌতুহল দমন করতে পারিনি। ডায়েরীটা নিয়ে পড়ে ফেলি। সেখানে কী লেখা ছিল জান?
ছেলেঃ কী?
মহিলাঃ
শুনলে তুমি আমকে আর কখোন অভিযোগ করবে না!
ছেলেঃ
বলো। শুনি।
মহিলাঃ
একটা চিঠি লেখা ছিল। তোমার বাবাকে। সেখানে লেখা ছিল, “আমার ক্যান্সার। আমি আর
বেশিদিন বাঁচবো না। আমি জানি, আমি মারা যাওয়ার পর আমাদের এই দুধের শিশুটা খুব একা হয়ে
যাবে। ওকে দেখাশোণা করার জন্য একজন মানুষের খুব দরকার হবে। তাই তুমি হয়তো আবার
বিয়ে করবে। অনেক বড় স্বার্থপরের মত শোনালেও মৃত্যুর আগে আমি মনের কথা না বলে পারছি
না। আমি চাই না, আমার সন্তানের জীবনে দ্বিতীয় কেউ আসুক। আমি ওর মা। তুমি ওর বাবা।
এ পর্যন্তই। অন্য কোন মহিলাকে যেন ও মা না ডাকে। তুমি ওকে মানুষ করবে। আমি বিশ্বাস
করি তোমাকে। আমি জানি, তুমি পারবে।” এই চিঠির স্পষ্ট অর্থ, তোমার বাবা যেন আর বিয়ে
না করে সেটাই তিনি চান।
ছেলেঃ
আর তাই তুমি?
মহিলাঃ ঠিক তাই।
মহিলাঃ ঠিক তাই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন