“দশ ট্যাকা দেন ক্যান?” কিছুটা রাগ মিশ্রিত গলায় বলল
রউফ। “কত চাস?” তীব্র বিরক্তি নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল আসিফ। “ভাড়াতো পনের ট্যাকা
হয়।” রাগ আর সেই সাথে কিছুটা অসহায়ত্ব নিয়ে জবাব দিল রউফ। “কয় কি? পনের ট্যাকা?
পাগলে কামড়াইছে তোরে?” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে রওনা হয়ে গেল সেখান থেকে। তবে যাওয়ার আগে এতটাই ঘৃণাভরে
তাকালো সে রিকসাটা আর রিকসাআলাটার দিকে, মনে হল যেন সে কষে একটা লাথি মারার
প্ল্যান করছে। কপাল ভাল রউফের, সেধরণের কিছু করেনি আসিফ। “ভাই, বারো ট্যাকাতো দিবের পারতেন!” কোন রকমে বলল রউফ। কিন্তু, সে কথা
বোধহয় আসিফের কানে গেলই না। মাত্রই তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলে মোবাইলের টাকা
গেছে শেষ হয়ে। এদিকে এখনি তাকে আরেক বান্ধবীর
(সে তার হবু গার্লফ্রেন্ড) সাথে কথা বলতে হবে। তাই দ্রুত সে আগাল ফ্লেক্সিলোডের
দোকানের দিকে। ৩০০ টাকা ফ্লেক্সি করল নিজের মোবাইলে; তার হবু গার্লফ্রেন্ডের
সাথে কথা বলার জন্য। আরও ৫০০ টাকা ফ্লেক্সি করল তার আসল
গার্লফ্রেন্ডের মোবাইলে।
এদিকে রউফ আরেকটা ভাড়া পেয়ে গেছে ততক্ষণে। রাত প্রায় ১২টা বাজে। আরো অনেকটা
সময় থাকতে পারলে ভালই হত। এই সময় অল্প কষ্টে ভাল ইনকাম হয়। কিন্তু কিছু করার
নাই। ফিরতে হবে এখনি।
রউফের বাসা ছিল পাবনায়। কাজের সন্ধানে এসেছে
ঢাকায়। বাড়ীতে আছে মা, বাবা আর ছোট দুই বোন। বাবা অসুস্থ। সারাদিন কোন খবরও নেয়াও হয়নি। কাছে একটা মোবাইল
অবশ্য আছে। কিন্তু এখন টাকা নেই মোবাইলে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবেগ দমন করতে হয়। সে যদি মোবাইলে টাকা তুলত তাহলে তার একবার ইচ্ছে হত ফোন করে বাবার খবর নেয়ার। কিন্তু তাতে দুই টাকা হলেও যেত মোবাইল
থেকে। আর এই দুই টাকার জন্য তাকে হরহামেশাই অনেক অপমান সহ্য করতে হয়। তাই “দুই
টাকা” তার কাছে অনেক কিছু। তাছাড়া বাসায় গেলেতো জানতেই পারবে সব কিছু।
বাসায় ফিরেছে আসিফ। মা রান্না করে বসে ছিল ওর জন্যে। বাসায় ঢুকেই মাকে জানিয়ে দিল সে বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে। তাই
আর কিছু খাবেনা। আসিফের মা কিন্তু এতটা সময় আসিফের জন্যই না খেয়ে বসে ছিল। আসিফ
ব্যপারটা আগে জানালে হয়ত খেয়ে নিতেন তিনি। । যাইহোক, এত কিছু ভাবার মুডে
নেই এখন আসিফ। সে সোজা গিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে কথা বলতে শুরু
করল হবু গার্ল ফ্রেন্ডের
সাথে। সারারাত চলবে ওর কথা।
রউফ বাসায় ফিরে দেখে ওর মা না
খেয়ে বসে আছে। প্রচন্ড ক্ষেপে গেল রউফ। “তুমাক না খায়ে বসে থাকবের কইছে কিডা?
বাপের মতন তুমিও কি অসুস্থুর হ্যবে নাকি??
বাপেক দ্যাখারই টাইম পাইনে, তুমি অসুস্থুর হলি পারে দেখবিনি কিডা?” রউফের মা কোন কথারই জবাব দিল না।
সে জানে তার ছেলের এই রাগ তার প্রতি ভালবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তাই কোন কথা না বলেই ভাত
বাড়ল সে। খেতে বসল ছেলের সাথে। “আব্বার কি অবস্থা?” খেতে খেতে জানতে চাইল রউফ। “অবস্থা
ভালা না বাজান। আর হচ্ছে না। কাল মনে কয় যে হাসপিতালে নিয়াই লাগবি।” মুখটা শুকিয়ে
গেল রউফের। একবার হিসাব করে নিল টাকা পয়সার। টাকা থাকুক আর না থাকুক কিছুই করার
নাই। ভর্তি করতেই হবে। কেন জানি অস্বস্তি
হতে লাগল রউফের। ওর মন বলছে অনেক টাকা পয়সার ধাক্কা অপেক্ষা করছে সামনে। হাতেত
বলতে গেলে কিছুই নেই! আচ্ছা? খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আরেকবার রিকসাটা নিয়ে বের হলে
কেমন হয়? রউফেরতো নিজের রিকসা। তার স্বদব্যবহারতো করা উচিত। কত কষ্ট করে ওর বাবা
এই রিকসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আর দেরী নয়, আবার বেড়িয়ে পড়ল রউফ রিকসা নিয়ে। সারা রাতে একজন যাত্রীও যাদি পায় সেটাই লাভ। আর আবহাওয়াও ভাল এখন। কষ্ট হবে না
তেমন।
সকাল হয়ে
গেছে। কিন্তু আসিফের জন্য এটা সবে রাত। গতকাল সারারাত কথা বলেছে ও। এখন খুব
ক্লান্ত। ঘুমাতেই যাবে এমন সময় কল করল তার আসল গার্লফ্রেন্ড। মহা ঝামেলা!! গতকালতো
সে তার হবু গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলেছে। কালই সে প্রোপজ করেছে। জবাবে এখনও কিছু
বলেনি সে। তবে আসিফের ধারণা নির্ঘাত রাজি হবে সে। রাজি না হলে সারারাত কথা বলত না।
যাইহোক, এখন একটু ঘুমাবে ভাবছিল। কিন্তু কীভাবে
ঘুমাবে? আসল গার্লফ্রেন্ডইতো এখন ফোন করছে ওকে। না রিসিভ করলেতো
যাচ্ছেতাই ব্যপার হয়ে যাবে। কী আর করা। আবার কথা বলা শুরু করল আসিফ। ঘুম নেই আজ তার কপালে!
এদিকে সারারাত
রিকসা চালিয়ে মোটামোটি সফল হয়েছে রোউফ। প্রত্যাশা অনুযায়ী না
হলেও মোটামোটি ইনকাম হয়েছে তার। দ্রুত বাসায় গেল সে বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে। ভর্তি করিয়ে মাকে রেখে আসল বাবার কাছে আর ভাবল একটু ঘুমিয়ে নেবে। সারারাত
পরিশ্রমের পর প্রচন্ড ক্লান্ত সে। কিন্তু উপায় নেই। ঠিক এই সময়েই একটা লোভনীয় ভাড়া
পেল সে। একটা জুটি রিকসা রিজার্ভ করে ঘুরবে। এইসব ভাড়ায় লাভ অনেক। তাই সিদ্ধান্ত
পাল্টে দ্রুত রিকসা নিয়ে রওনা হল রউফ। ভাল করে তাকিয়ে দেখে বেশ অবাক হল রউফ। এটাতো
কালকের সেই ছেলেটা!
আসিফও চিনতে
পেরেছিল রউফকে। আজ কিন্তু ভাড়া নিয়ে টু শব্দটিও করা চলবে না। করলে গার্লফ্রেণ্ডের
সামনে প্রেস্টিজ থাকবে না একদম। এই গার্লফ্রেন্ডের হুকুমেই ঘুম বাদ দিয়ে সোজা সে
চলে এসেছে ডেটিং করতে। ঘুমের কোন আশা নেই আজ!
বিকাল হয়ে এসেছে। তেমন কোন ইনকামই হয়নি আজ। রাতের
ইনকামটুকু না হলে আজ না খেয়েই থাকতে হত। অবশ্য খেতেও পারেনি তেমন কিছু এখনও।
আসিফ দুপুরে
লাঞ্চ করে করেছে গার্লফ্রেন্ডের সাথে। আর বিকালে তার হবু গার্লফ্রেন্ড ফোন করে
জানিয়েছে সে রাজি!! তাই দুপুরেও না ঘুমিয়ে সোজা আবার বেরিয়ে পড়ল আসিফ এই নতুন
গার্লফ্রেন্ডের সাথে ডেটিং করতে। ঘুম সত্যিই নেই আজ কপালে। একটা রেস্টুরেন্টে
অপেক্ষা করছে নতুন গার্লফ্রেন্ড। বাড়ী থেকে বেশি দূরে না। তাই রিকসাতেই যাবে আসিফ।
রিকসায় উঠে দেখে আবার সেই রিকসাআলাটাই!
এতকিছুর
মধ্যেও যেন একটু মজা পেল রউফ। আসিফকে নিয়ে রিকসায় উঠে বসবে এমন সময় ফোন আসল রউফের
মোবাইলে। “হ্যালো আম্মা!.........কি কও? আব্বা মারা গেছে???......” কিছু সময় স্থির হয়ে রইল রউফ। ওর মনের মধ্যে কি চলছিল তা ওই জানে। একই সময় আসিফেরও ফোন এসেছিল। তাই হয়ত
রউফের কথাগুলো শুনতে পায়নি আসিফ। পেছন থেকে সে কষে ধমক লাগালো রউফকে,”ওই ব্যাটা
বইসা রইলি ক্যান? রিকসা কি আমি চালামু?” রউফ চুপ করে রইল। ওর মাথায় এখন অন্য
চিন্তা। মরলেও অধ্যায় এখনও শেষ হয় নেই। এখনও কিছু খরচ করতে হবে ওকে। দাফন কাফনের
ব্যবস্থা করতে হবে। খরচ আছে অনেক। চিন্তা আরেকটাও আছে। এই শোক হয়ত সামাল দিতে পারবে না মা। অসুস্থ হয়ে পরতে পারে সেও। সুতরাং
সেটাও মাথায় রাখতে হবে। তাই সিদ্ধান্ত নিল সে, এই ভাড়াটা নামিয়ে দিয়ে সে আরো অন্তত
দুইটা ভাড়া নেবে তারপর যাবে। রউফের ফোনে আবার কল আসছে। এবার ফোন করেছে তার ছোট
বোন। ফোনটা রিসিভ করল না সে। দুইটা কারনে। একঃ ফোন রিসিভ করলে সময় নষ্ট হবে। দুইঃ
সে যদি এখন কথা বলে তার বোনের সাথে, তাহলে অনেক বেশি আবেগপ্রবন হয়ে পড়বে সে। তাহলে
আর রিকসা চালানোর মত শক্তিটুকুও শরীরে থাকবে না। হাত পা বাঁধা তার। এই মুহূর্তে
রিকসা তাকে চালাতেই হবে।
রিকসা থেকে
লাফ দিয়ে নামল আসিফ। সোজা দশ টাকা দিয়েত পা চালাল রেস্টুরেন্টের ভেতরে। স্থির চোখে
তাকিয়ে রইল রউফ আসিফের পথের দিকে। অস্ফুটে মুখ থেকে বেড়িয়ে এল, “দশ ট্যাকা দেন
ক্যান? ভাড়াতো পনের ট্যাকা হয়। বারো ট্যাকাওতো দিবের পারতেন...............”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন