শনিবার, ২৮ জুন, ২০১৪

সংগীত চর্চা; শ্রোতার কাজ কি শুধুই শুনে যাওয়া?

গান ভালবাসেন না, এরকম মানুষ মনে হয় না কেউ আছেন। আর আমরা বাঙ্গালীরা হয়তো একটু বেশিই গান পাগল। তো, গান শোনা কিংবা গান গাওয়ার মত ব্যপারগুলোর সাথে আমরা অনেক অনেক কাল আগে থেকেই পরিচিত। আমি জানি না কবে, কোথায় কীভাবে গান সৃষ্টি হয়েছিলকিংবা কে পৃথিবীর প্রথম শিল্পী? আমি শুধু গান শুনতে ভালবাসি। গান গাইতেও আমার ভাল লাগে। খুব ছোটবেলায় মায়ের উতসাহে গান শিখতাম। শিক্ষা কতটুকু হয়েছিল জানি না। তবে সুরের উঠানামা, গলার কারুকাজ এগুলো আমাকে আকৃষ্ট করতো।

এবার মূল কথায় আসি। আমাদের হাতের নাগালে থাকা লক্ষ লক্ষ গানের মধ্যে কোন গান কে পছন্দ করবে এটা একান্তই যার যার ব্যক্তিগত ব্যপার। কিন্তু, তবুও কিছু কথা না বললেই নয়। রবি ঠাকুরের যুগের কথাই ধরি। সেসময় রবীন্দ্র সংগীত ছিল আধুনিক গান। অনেক অভিভাবকইএই রবীন্দ্র সংগীতকে বাঁকা চোখে দেখতেন ঠিক যেভাবে এসময়ের অনেক অভিভাবক রক গানকে সহজভাবে নেন না! আমি যতটুকু জানি, উচ্চাংগ সংগীত সম্পর্কে রবি ঠাকুরের মন্তব্য ছিল এমন, যে গানের মাধূর্য অনুধাবন করার ক্ষমতাই সাধারণ মানুষ রাখে না, সেই গান কীভাবে সর্বসাধারনের হয়? ব্যপারটা অনেকটা সেরকমই। উচ্চাংগ সংগীতের মাধুর্য নিয়ে গবেষনা করবেন তাঁরা, যারা সংগীতের সাধনা করছেন। আমরা সাধারন মানুষ সংগীত ভক্ত সংগীত সাধক নই।

এবার আসি বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে। উচ্চাংগ সংগীতের নামটাই হয়তো আমাদের অনেকের অজানা এখন। সেই যুগের উচ্চাংগ সংগীতের মতই এই যুগের রবি ঠাকুর কিংবা কাজী নজরুল। তবে, তাদের গানেও উচ্চাংগের প্রভাব কম নয়। নজরুল সংগীতের অনেক গান উচ্চাংগ প্রভাবিত এটাতো সবারই জানা। রবীন্দ্রসংগীতের মাঝেও অনেক গান আছে উচ্চাংগ প্রভাবিত। যেমন, “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে” গানটি মালকোশ রাগ প্রভাবিত। এই গানটি শুনলেই যে দূর্গা পূজার একটা আবহো মনের মাঝে তৈরি হয় তার কৃতিত্ব কিন্তু ওই মালকোশ রাগেরই। এখনও এসব গান আমরা শুনি। রবি ঠাকুর বিশ্বাস করতেন তার সৃষ্টিকে মানুষ মনে রাখবে শত বছর পরেও।  তার এই বিশ্বাস গোটা বাঙলী জাতি সত্য প্রমান করেছে, করছে।

শত বছর পরেও রবি ঠাকুরের গান আমরা শুনছি, এটা আনন্দের খবর। কিন্তু, এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখা দরকার গত প্রায় একশ বছরেও আমরা জীবনানন্দ, সুকান্ত, কাজী নজরুলের মত কাউকে পাইনি। এ দায় কাদের? এক্ষেত্রে আমাদের মত সাধারন শ্রোতাদের কি কোন দায় নেই??

গানের চর্চা কিন্তু চলছে পুরো দমে
এখনকার মানুষ হয়তো আগের চেয়ে অনেক বেশি গান পাগল। কানে হেডফোন লাগিয়ে রাখাটা যেন পথ চলার ক্ষেত্রে অনেকটাই অপরিহার্য! রিয়েলিটিশো’র ছড়াছড়ি চারদিকে। নতুন নতুন সংগীত তারকার ভিড়ে মিডিয়া অস্থির! কিন্তু, গান বাজনার বৈচিত্র কতটুকু আসছে?

আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এখনকার গানগুলো অনেকটাই “কম্পোজিশন বেজড”। অর্থাৎ গান কতটা সুন্দর হবে তার বেশিরভাগটাই নির্ভর করছে কম্পোজিশনের উপরে


আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছেলে একটা ব্যান্ডদল তৈরি করেছে। নাম রেখেছে “টার্বো ক্র্যাটার”। তাঁরা সবাই রক গানের ভক্ত। ছেলেগুলোর মিউজিক সেন্স আসলেই ভাল। এখানকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁরা অংশ নেয়। আমি নিজে তাদের সাথে গান করেছি। সুরজ্ঞান তাদের আসলেই ভাল। কিন্তু, আমার প্রশ্ন হচ্ছে সংগীত মানে কি শুধুই সুরের কারুকাজ? লিড গীটার, বেজ গীটারের ঝংকারের সাথে ড্রাম, কী বোর্ড সবমিলে যে দ্যোতনা সৃষ্টি হয় তাতে মানুষ মুগ্ধ হবেই। কিন্তু একটাই সমস্যা, এই সব গান পাগল ছেলেরা শুধু সুরটাকেই দেখে। গানের স্কেল বোঝার চেষ্টা করে, লিড তুলে আনন্দ পায়। কিন্তু, এত কসরত করে যা গাওয়া হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় একেবারেই সাদামাটা কথা। আরও পরিষ্কার করে বললে, হয় প্রেম নয় বিরহ। প্রেম, বিরহ নিয়ে যুগে যুগে অনেক লেখা হয়েছে। তারপরও এই চিরাচরিত বিষয়টিকেও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন্ত্ব আনা অসম্ভব নয়। কিন্তু, সেই চেষ্টা এযুগের গীতিকাররা করেন না অথবা তাদের সামর্থ্যের অভাব আছে বলতে হবে।

আরেকটা কথা। মানে আরেক ধরণের গানের কথা। তা হলো, পুরোপুরি সফটওয়্যার নির্ভর কম্পোজিশন। এফএল স্টুডিও’র মত সফটওয়্যার দিয়ে শিল্পীর কন্ঠকে আমূল পরিবর্তন করে ফেলা। আর সেইসাথে বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্রের বাজনা যুক্ত করে গানকে মনমুগ্ধকর করে তোলা। যে গান হয়তো খালি গলায় গাইলে কেউ শুনতো না, সেই গানই সফটওয়্যার দিয়ে কম্পোজিশন করার পর যে শোনে তারই ভাল লাগে! এক্ষেত্রে , আমার চোখে আসল শিল্পী অবশ্যই যিনি কম্পোজিশন করছেন তিনি। শিল্পীর চেয়ে সুরের জ্ঞান তাকে অনেক বেশি রাখতে হয়। আমার মনে হয়, সফটওয়্যার দিয়ে যারা গান কম্পোজিশন করেন তাঁরা অবশ্যই আগেকার দিনের শীল্পিদের চেয়ে সুরের জ্ঞান অনেক অনেকবেশি রাখেন। তো, এই বিষয়টিকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেন। কারন, এইসব গানে শীল্পির কৃতিত্ব থাকে না বললেই চলে। কিন্তু, সেই রবিঠাকুরের কথাই যদি ধরি, তিনি বলেছিলেন, মানুষ যদি শুনে আনন্দ পায়, তাহলে সমস্যা কোথায়? তো, সফটওয়্যার নির্ভর এসব গান শুনে মানুষ দিব্যি আনন্দ পাচ্ছে, তাহলে সমস্যা কোথায়?

প্রযুক্তির যুগে সফটওয়্যার নিয়ে গবেষনা করে গান কম্পোজিশন করাকে আমি ছোট করে দেখি না। কারন, এতে গান আগের চেয়ে সুন্দর হচ্ছে। সেইসাথে, গীটার, ড্রামস নিয়ে যারা সাধনা করছেন, তাদেরও আমি স্যালুট জানাই। স্টেজ পার্ফমেন্স তাদের ছাড়া অচল। যদিও, এইযুগে, সময়ের দাম এতটাই যে, মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতেই আমরা বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তবে, এতে আশঙ্কার কিছু নেই। সফটওয়্যার দিয়ে গান কম্পোজিশন হচ্ছে,এর অর্থ এই নয় যে, এসব বাদ্যযন্ত্র বাজাতে মানুষ ভুলে যাবে। এই বাদ্যযন্ত্রগুলো সম্পর্কে ধারনা না থাকলে, কোন সফটওয়্যার দিয়েই গান কম্পোজিশন করা সম্ভব নয় বলেই আমি জানি।

আমার পরিচিত একজনের কথা। সে একসময় কবিতা লিখতো। কিন্তু, এখন আর লেখে না। কেন? কারন, কবিতা ক’জন পড়ে?? তাহলে, কবিতা কি শুধু মানুষকে পড়ানোর জন্য?  নিজের ভাল লাগার জন্য কি কিছুই করতে নেই?? এই ব্যপার থেকে আরও একটা বিষয় অবশ্য জানা যায়, গান এখন সবচেয়ে লাভজনক পন্যগুলোর একটি।

এবারে, শেষ কিছু কথা বলতে চাই। দেখাই যাচ্ছে, শ্রোতাদের ভূমিকা আসলে ব্যপক।তো, যে শ্রোতাদের উপর প্রায় সবকিছুই নির্ভর করছে, সেই শ্রোতারা আসলে কতটুকু “শ্রোতা”? আমি কাউকে ছোট করছি না। কিন্তু, অত্যন্ত দূঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এখনকার শ্রোতারা গানটাকে ঠিক কীভাবে নেন, আমি  বুঝতে পারি না। আমি নিজেও বুড়ো কেউ নই, এ যুগেরই একজন। কিন্তু, খুব কষ্ট পাই যখন দেখি, প্রায় সব গানের কথা একেবারেই এক। একটু বৈচিত্র আনার চেষ্টা কেন নেই?কারন, সম্ভবত একটাই। অতি সহজে স্টার হওয়া! স্টার হওয়ার চেয়েও বড় লক্ষ্য, বড়লোক হওয়া। রাতারাতি বড় শিল্পী হয়ে কোটি কোটি টাকা কামাই করবো, এটাই হলো, এ যুগের শিল্পীদের লক্ষ্য।  তা না হলে, একজন শিল্পীর গানের মানের চেয়েও তার চেহারা, তার শারীরিক গড়ন কি করে বেশি গুরুত্বপূর্ন হয়???
আসল কথা হলো, যেহেতু, শ্রোতাদের যা খাওয়ানো হচ্ছে, তাঁরা তাই খাচ্ছে! কেউ গাইলেন, “চাইনা মেয়ে তুমি অন্য কারো হও...” অমনি আমরা মহা আনন্দের সেই গান শুনতে শুরু করলাম (ভাবটা এমন, আরে এতো আমারই মনের কথা!) আবার কেউ বললেন, “আমি তোমার মনের ভেতর একবার ঘুরে আসতে চাই”। শুনতে ভাল লাগছে, আমরা শুনছি। অনেক পুরাতন গানগুলো, যেগুলো আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, সেগুলোই আজ উঠে এসেছে রিমিক্সের কল্যানে। রিমিক্স আর কি? নতুন ধরণের কম্পোজিশন ছাড়াতো কিছু নয়? তার মানে ঐ কম্পোজিশনই হলো সবকিছু।
লালন ফকিরেই সেই গানটির কথাই ধরুনঃ

“ বাড়ির পাশে আরশি নগর
সেথায় পড়শি বসত করে।
 একঘর পড়শি বসত করে।
 আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।”
রিমিক্স হওয়ার পর, এখন এই গানগুলো মানুষ শুনছে। কিন্তু, এ গানের অর্থ কত গভীর সেটা ক’জন ভাবছে? এই গান গাইছেন এমন একজনই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এই গানের অর্থ। আমি আগে অনেক ভেবেছিলাম গানের অর্থ নিয়ে। তাই বলতে চেষ্টা করলাম নিজের মত করে। কতটুকু ঠিক বলেছি জানিনা, কারন আমিও এযুগের সাধারণ শ্রোতাদের কাতারেই পরি। আমার মনে হয়েছে, আরশিনগর এর অর্থ আয়ান মহল ধরনের কিছু। যাকে আসলে মানুষের মনের সাথে তুলনা করা যায় (সর্বত্র নিজেরই প্রতিচ্ছবি!)। আর, এখানে আরশিনগর বলতে এখানে ঈশ্বরের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। বাড়ির পাশে,  অর্থাত তিনি কত কাছে আমাদের! সেথায় পরশি বসত করে, যাকে একদিনও দেখা হয়নি। অর্থাৎ এই পড়শিই হলে স্বয়ং ঈশ্বর! যে আমাদের অনেক কাছে থাকার পরেও আমরা দেখতে পাই না। এখন আমরা যারা রিমিক্স করার পর এই গান শুনছি, তাঁরা এই গানের অর্থ বোঝা চেষ্টা কতটুকু করছি?

সেই যুগ আসলেই আর নেই। গানের ভাব বুঝে সেই অনুসারে গাওয়া হলো শিল্পীর প্রথম এবং প্রধান কাজ। কিন্তু, এখন এই কথা কতটুকু মানা হয়? “বড় একা একা লাগে আমার/ লাগে না না ভাল আর ”- এই গানের যে সুর, তাতে মনে হয় “বড় একা একা লাগে” এত বড় সুসংবাদ যেন মনে হয় আর হয় না!!

সবশেষে এটাই বলতে চাই, আমাদের অর্থাৎ শ্রোতাদের অনেক বড় একটা ভূমিকা রয়েছে, যা আমরা পালন করছি না। রবি ঠাকুরের কথা আবারও বলছি। তার আবির্ভাবের সময়টাতে তাকেও অনেক বাধার মুখে পরতে হয়েছে। তার পক্ষে যেমন অনেক মানুষ ছিল, তার সমালোচনা করতেও মানুষ ছাড়েনি
অনেক কঠিন পথা পাড়ি দিতে হতো সেসময়কার শিল্পীদের। কিন্তু, এসময় উলটো চিত্র। যে কাউকেই স্টার বানানোর জন্য মিডিয়া যেন উঠে পরে লাগে! আর মানুষও হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়েই খুশি। মানুষ আসলে নতুনত্ব ভালবাসে। তাই নতুনকে বরণ করতে চায়। কিন্তু, সমালোচনার আসলেই অনেক দরকার। এখনকার শিল্পীদের সমালোচনা নেই।

অনেক অনেক কথা বললাম। অনেক ধৃষ্টতাও দেখালাম। অনেক গুনী মানুষের সমালোচনা করলাম। জানি অপরাধ করলাম। কিন্তু, ব্লগতো মনের কথা বলারই জায়গা, তাই না? আমার খারাপ লাগে তাদের জন্য, যারা নীরবে নিভৃতে আজও সংগীত সাধনা করে যাচ্ছেন কোন প্রান্তে বসে, যেখানে তাদের খোজ নেয়ার কেউ নেই। তার স্টার হতে চান না। তাঁরা শুধু সংগীত ভালবাসেন। সংগীতকে পেশা হিসেবে দেখেন না। সংগীতকে পন্য করতেও চানা না। এখনও এদেশের অনেক মানুষ আছেন যারা সংগীতের সাধনা করে জীবন পার করে দিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সংগীত সাধনার জিনিষ, প্রচারের জিনিষ নয়। আমরা কি, এসসব মানুষের খবর রাখি? তাঁরা বিলুপ্তির পথে। রাখি না। এতোসব করার সময় কোথায় আমাদের??

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন